বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পোল্ট্রি মুরগির খাবার তালিকা সম্পূর্ণ গাইড
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক পোল্ট্রি মুরগির খামার কিভাবে শুরু করবেন, খাদ্য
ব্যবস্থাপনা, রোগ প্রতিরোধ, বায়ো সিকিউরিটি ও লাভের সঠিক হিসাব সহ সম্পূর্ণ
গাইড।
পেজ সূচিপত্র: এই ব্লগ পোস্ট থেকে আমরা পোল্ট্রি মুরগি বিষয়ে জানার চেষ্টা
করব-।এই ব্লগ পোস্টে বাণিজ্যিক পোল্ট্রি মুরগির খামার, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ
প্রতিরোধ ও লাভের হিসাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
পোল্ট্রি মুরগির খামার কি: পোল্ট্রি মুরগির খামার হলো এমন একটি লাভজনক ব্যবসা
যেখানে বাণিজ্যিকভাবে মুরগি উৎপাদন করা হয় যা মূলত ডিম ও মাংস উৎপাদনের জন্য
বেশি ব্যবহার হয়। আমাদের দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের
প্রোটিনের চাহিদা অনেক বেশি। কারণ দেশের বেশিরভাগ মানুষ খেটে খাওয়া। কিন্তু সেই
তুলনায় প্রাণিজ আমিষ এর উৎপাদন এখনো পর্যাপ্ত নয়। এই ঘাটতি পূরণ করার জন্য
পোল্ট্রি খামার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং এটি বর্তমানে একটি সম্ভাবনাময়
ব্যবসায় রূপান্তর হয়েছে।
পোল্ট্রি মুরগি মূলত উন্নত জাতের হাইব্রিড মুরগি যা বিশেষভাবে বাণিজ্যিক বংশের
চাহিদা উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা হয় এদের মাংস নরম সুস্বাদু এবং দ্রুত
বাজারজাতযোগ্য হওয়ার কারণে এই মুরগি মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
সাধারণত পোল্ট্রি মুরগি মাত্র দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে খাবার উপযোগী হয়, যা
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও
খামার ব্যবস্থাপনার উপর
নির্ভর করে। কম খরচে যদি তুলনামূলক বেশি লাভ এবং দ্রুত আয় করা সম্ভব হয় তাহলে
এটি উত্তম। তাই বর্তমানে এই ব্যবসা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বাণিজ্যিক পোল্ট্রি খামার কেন লাভজনক: বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো কৃষিভিত্তিক
কাজের সাথে জড়িত। তারই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্যিক পোল্ট্রি খামার একটি লাভজনক ও
সম্ভাবনাময় কৃষি ব্যবসায়ী হিসেবে দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অল্প পুজি বিনিয়োগ
করে খুব কম সময়ের মধ্যে লাভ করা সম্ভব হওয়ার কারণে এটি বিশেষ করে তরুণ
প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
বর্তমান শিক্ষিত সমাজের মানুষেরা আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার উন্নত
জাতের মুরগি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পোল্ট্রি খামারকে সহজে লাভজনক করে
তুলছেন। আর এর জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা সেই অনুযায়ী খামার স্থাপন করলে উৎপাদন
বৃদ্ধি পাবে এবং ঝুঁকি কমে যাবে।
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পোল্ট্রি খামার বেশ লাভজনক ব্যবসা। সাধারণত মুরগির খামার দুই
ধরনের হয় পারিবারিক খামার ও বাণিজ্যিক খামার। পারিবারিক খামারে অল্প কিছু মুরগি
পালন করে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়, যা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খামার তৈরিতে সম্ভাবনার
দুয়ার খুলে দেয়। আর এতে করে ভবিষ্যতে বড় আকারে বাণিজ্যিক খামার গড়ে তুলতে
সাহায্য করে।
দেশে উৎপাদনের উদ্দেশ্যের উপরে ভিত্তি করে খামারকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
যথা-ㆍ•
•ব্রয়লার খামার: যার উদ্দেশ্য মাংস উৎপাদন করা অল্প সময়ে।
•লেয়ার খামার: যা দিয়ে খামার গুলোতে ডিম উৎপাদন করা হয়।
তবে আপনি যে ধরনের খামার করুন না কেন যে কোন খামার করার জন্য প্রয়োজন সঠিক
পরিকল্পনা, পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবস্থা এবং তার সাথে
সঠিক পরিচর্যা যা আপনাকে লাভের দিকে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিবে।
পোল্ট্রি খামারের জন্য সঠিক স্থান ও পরিবেশ: যেকোনো কাজ শুরু করার আগে পরিকল্পনা
করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অনেক খামারি ভাই আছেন যারা কোন পরিকল্পনা ছাড়াই খামার
শুরু করেন। এখানেই তারা বড় ভুল ঠিক করে বসে থাকেন। কারণ, পোল্ট্রি মুরগি পালনের
ঘর যদি সঠিকভাবে তৈরি না হয় তাহলে সেই খামার থেকে লাভ করা কথা চিন্তা করা ঠিক
না।
তাই আপনি যদি পোল্ট্রি মুরগি পালন করতে চান তাহলে প্রথমে জানতে হবে তাদের থাকার
পরিবেশ কেমন হওয়া উচিত।
পোল্ট্রি খামার তৈরি করার শর্ত সমূহ নিম্নে দেওয়া হল-
1. খামারের অবস্থান ও দিক
2. শেডের অবকাঠামো
3. খামারের প্রস্থ ও ঘরের উচ্চতা
4. প্রজাতি অনুযায়ী জায়গা(ব্রয়লার, লেয়ার, সোনালী)
5. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা
6. বিদ্যুৎ সংযোগ ঠিক রাখা
7. সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বেষ্টনী।
খামারের দিক ও অবস্থান:আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ খুব কম সময়ে অল্প
পুঁজিতে ভালো লাভ করার একটি স্বপ্ন দেখে থাকেন। কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে
তা সম্ভব হয় না। তাই বেশিরভাগ খামারি ভাই-বোন না বুঝে পোল্ট্রি মুরগির খামার
দিয়ে লোকসানে ভোগেন আর এই লোকসান করার মূল কারণ হচ্ছে ভুল অবস্থান নির্বাচন।
আমাদের দেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী বাংলাদেশের সাধারণত বাতাস উত্তর- দক্ষিণ
দিক থেকে প্রবাহিত হয়। তাই খামারি ভাইদের উচিত এ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে মনে
রাখা।
খামারের প্রস্থ ও ঘরের উচ্চতা: শেডের ক্ষেত্রে প্রস্থ এবং ঘরের উচ্চতা অনুযায়ী
চাষী ভাইদের ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
* শেডের প্রস্থ ২২-২৩ ফুট অর্থাৎ ২৪ ফুটের বেশি না
* দৈর্ঘ্য প্রয়োজন অনুযায়ী পাশের উচ্চতা ৬-৭ ফুট
* মাঝের উচ্চতা হবে ৯ থেকে ১০ ফুট যদি দোচালা শেড হয় তা হলে
* চালের বর্ধিত অংশ দুই ফুট কারন ঝড় বৃষ্টি থেকে নিরাপত্তার জন্য।
আমি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী বলি যদি খামারের দৈর্ঘ্য উত্তর-দক্ষিণ বরাবর
হয়ে থাকে তাহলে সকাল ও বিকালে সরাসরি রোদ শেডের উপর পড়ে। এতে শেড অতিরিক্ত গরম
হয়ে যায় এবং মুরগির হিট স্ট্রোক,গ্যাসপিং,ও উৎপাদন কমে যাওয়ার মত সমস্যায়
পড়তে পারে। তাই আমাদের উচিত খামারের দৈর্ঘ্য পূর্ব-পশ্চিমে করা।
মুরগির সংখ্যা অনুযায়ী জায়গা: বিশেষ করে মুরগির খামার করার ক্ষেত্রে তা ব্রয়লার
হোক কিংবা সোনালী কিংবা দেশি আপনি যেটাই চাষ করেন না কেন আপনাকে সংখ্যা অনুযায়ী
জায়গা নির্বাচন করতে হবে।যেমন-
•১০০০ ব্রয়লার অর্থাৎ ১২০০ বর্গফুট
•১০০০ সোনালি অর্থাৎ ৭০০ বর্গফুট
তবে পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী যদি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্রয়লার চাষ করতে চান
তাহলে ব্রয়লারের ক্ষেত্রে মাচা পদ্ধতির সব থেকে বেশি লাভজনক। কারণ এখানে লিটার
ব্যবস্থাপনা করার ক্ষেত্রেও সহজ হয়।
পোল্ট্রি মুরগির খাদ্য ও পরিচর্যা: নির্দিষ্ট সময়ে সঠিক ওজনের জন্য সুষম খাবারের
চাহিদা অপরিসীম। একটি খামারের বেশিরভাগ খরচই শতকরা ৭০ শতাংশ খাদ্য খরচের মধ্যে
পড়ে। কাজেই খাবারের দিকে সঠিকভাবে নজর দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ
পোল্ট্রি খামারি ভাইয়েরা সঠিক খাদ্য নির্বাচন করতে না পেরে মারাত্মক ক্ষতির
মুখোমুখি হন। নিম্নমানের খাদ্য সামগ্রী খাওয়ানোর ফলে কাঙ্খিত ওজন আসে না, এর
জন্য অনেক টাকার ঔষধ খাওয়ান। ফলে খামারি ভাই গন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে
পড়েন এই সব দিক বিবেচনা করে উন্নতমানের বিজ্ঞানসম্মত ও সময় উপযোগী
ব্রয়লার ইটবাজার থেকে ক্রয় করতে হয় কারণ পোল্ট্রি মুরগি অত্যন্ত নাজুক
হয়।
| খাদ্য উপাদান | শুরুর দিকে | মধ্যবর্তি | শেষ পর্যায় |
|---|---|---|---|
| ভুট্টা | ৪৮ কেজি | ৫০ কেজি | ৫৩ কেজি |
| সয়াবিন মিল | ৩০কেজি | ২৬ কেজি | ২৪ কেজি |
| রাইচ পালিশ | ১০কেজি | ১২ কেজি | ১০ কেজি |
| ঝিনুক চূর্ণ | ২ কেজি | ২ কেজি | ২ কেজি |
| প্রোটিন ৬০% | ৮ কেজি | ৭ কেজি | ৮ কেজি |
| ডিলমিথিওনিন | ১৫০ গ্রাম | ১৩০ গ্রাম | ১৩০ গ্রাম |
| সয়াবিন তেল | ৫০০ গ্রাম | ২৪৮ গ্রাম প্রায় | |
| ডিপিসি | ৩০০গ্রাম | ৩০০গ্রাম | ৩০০গ্রাম |
| লবণ | ৩০০ গ্রাম | ২৮০ গ্রাম | ২৮০ গ্রাম |
| সালমোনেলা | ২৫০ গ্রাম | ২৫০ গ্রাম | ২৫০ গ্রাম |
| টক্সিন বাইন্ডার | ১২৫ গ্রাম | ১৩৫গ্রাম | ১৫০ গ্রাম |
| প্রিমিক্স | ৩০০ গ্রাম | ৩০০ গ্রাম | ৩০০ গ্রাম |
| ক্লোরিন ক্লোরাইড | ৭০ গ্রাম | ৭০ গ্রাম | ৬০ গ্রাম |
পোল্ট্রি মুরগির রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসা: পোল্ট্রি খামারে সফলভাবে লাভবান হতে
গেলে মুরগির সঠিক সুস্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা খামারি ভাইদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ
একটি বিষয়। খামারে যদি বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দেয় তাহলে মুরগির স্বাভাবিক
বৃদ্ধি নষ্ট হতে পারে। এতে করে খাদ্যগ্রহণ কমে যায় এবং দ্রুত মৃত্যুর হার বেড়ে
যায়। এর ফলে খামারের আর্থিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আমাদের বর্তমান বাংলাদেশের মতো গরম ও আদ্র আবহাওয়ার দেশে পোল্ট্রি মুরগি বিভিন্ন
ধরনের ভাইরাস, পরজীবীজনিত রোগ এবং ব্যাকটেরিয়ায় সহজে আক্রান্ত হতে পারে। তাই
খামার পরিচালনা শুরু থেকেই রোগ প্রতিরোধের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া
অপরিহার্য।
যেকোনো রোগ প্রতিরোধের জন্য সঠিক বায়ো সিকিউরিটি ব্যবস্থা গ্রহণ, নিয়মিত
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, তার সাথে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, সুষম খাবার আদান-প্রদান এবং
সঠিক সময় টিকাদান করতে হবে। এসব নিয়ম মেনে চললে মুরগির রোগ হবার ঝুঁকি অনেক
ক্ষেত্রে কমে যায় এবং উৎপাদন স্বাভাবিক থাকে।
তাছাড়া খামারে নতুন মুরগি আনার ক্ষেত্রে আলাদা করে কিছুদিন পর্যবেক্ষণে
রাখা উচিত, এটার কারণ হলো যাতে কোন সংক্রমক রোগ থাকলে তা অন্য মুরগীর মধ্যে যেন
ছড়িয়ে না পড়ে। একই সাথে খামারের ভেতরে সঠিক ও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল নিশ্চিত
করতে হবে, যাতে গ্যাস ভেতরে না জমে এবং মুরগির সুস্থ পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা:পোল্ট্রি খামার সবসময় পরিষ্কার
পরিচ্ছন্ন রাখা পোল্ট্রি মুরগি সুস্থতা বজায় রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। খামারের
ভেতরে মল-মুত্র নোংরা পানি বা খাবারের অবশিষ্ট অংশ জমে থাকলে তাড়াতাড়ি খুব
দ্রুত জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে করে মুরগি বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া
ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
তাই আমাদের দেশের খামারি ভাইদের উচিত নিয়মিত পোল্ট্রি খামারের মেঝে পরিষ্কার
করা। প্রয়োজন হলে পুরাতন লিটার পরিবর্তন করা এবং খামারের চারপাশে পরিষ্কার রাখা
অত্যন্ত জরুরী। কারণ খাবার ও পানির পাত্র প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে যাতে কোন
ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু এখানে বংশবিস্তার করতে না পারে।
এছাড়া খামারে নির্দিষ্ট সময় অন্তর জীবাণুনাশক স্প্রে ব্যবহার করা উচিত। এতে
ক্ষতিকারক জীবাণু ধ্বংস হয় এবং রোগের সংক্রমণ কমে যায়। খামারে প্রবেশের
আগে জুতা বা জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখা ভালো যাতে বাইরের জীবাণুর ভেতরে
প্রবেশ করতে না পারে।
সঠিকভাবে পরিষ্কার--পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে পোল্ট্রি মুরগির রোগ হওয়ার সম্ভাবনা
অনেক কমে যায়।তার সাথে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং খামারি ভাই-বোন দীর্ঘদিন লাভজনক
ভাবে ব্যবসা করতে পারেন।
বিশুদ্ধ পানিও সুষম খাবার: পোল্ট্রি মুরগির সুস্থতা তার সাথে দ্রুত
বৃদ্ধির জন্য পরিষ্কার পানীয় সুষম পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নোংরা
পানি বা যেকোনো ধরনের নিম্নমানের খাবার থেকে সহজে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে
যা মুরগির বৃদ্ধিকে কমিয়ে দিতে পারে।
তাই পোল্ট্রি মুরগিদের সব সময় বিশুদ্ধ নিরাপদ পানির সরবরাহ করতে হবে।
পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখা এবং প্রতিদিন পানি পরিবর্তন করা জরুরী, যাতে
করে কোন ধরনের রোগ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া সেখানে জন্মাতে না পারে।
পোল্ট্রি মুরগির খাবারের ক্ষেত্রে মুরগির বয়স ও প্রজাতির দিকে লক্ষ্য করতে হবে।
কারণ বয়স ও প্রজাতি অনুযায়ী সুষম খাবার প্রদান করতে হয়। যেমন-ব্রয়লার মুরগির
জন্য প্রোটিন ও এনার্জি সমৃদ্ধ খাবার এবং লেয়ার মুরগির জন্য ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি
করে তাই এগুলোকে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া উচিত। নিম্নমানের বাসি খাবার কখনোই একজন
ব্যবসায়ের দেওয়া উচিত না।
বায়ো সিকিউরিটি ব্যবস্থা: পোল্ট্রি খামারে রোগ প্রতিরোধের জন্য বায়ো
সিকিউরিটি ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন। খামারে বাইরের লোকজন, যানবাহন ও অন্যান্য
প্রাণীর অবাধ প্রবেশ বন্ধ রাখতে হবে কারণ এদের মাধ্যমে সহযোগী বিভিন্ন রোগ জীবাণু
খামারের প্রবেশ করতে পারে।
খামারে প্রবেশের আগে জীবাণুনাশক ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। প্রবেশপথে
বিভিন্ন বিষয়ে থাকতে পারে তাই জীবানুণাশক পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া
খামারে কাজ করার জন্য আলাদা পোশাক ও জুতা ব্যবহার করা উচিত। নিয়মিত খামারের
ভেতরে ও বাইরের জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে। এদের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস
ও পরজীবী ধ্বংস হয়।
নতুন মুরগি থেকে আলাদা রাখা: খামারের নতুন মুরগি আনার পর সেগুলোকে সরাসরি
মূল শেডের মধ্যে না এনে একে কিছু দিন আলাদা স্থানে রাখা প্রয়োজন এটা
বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থার মতোই। কারণ বাইরে থেকে আনা মুরগি অনেক সময় বিভিন্ন
সংক্রমক রোগে বা বিভিন্ন ধরনের জীবাণুতে আক্রান্ত থাকে পুরাতন মুরগির সংস্পর্শে
আসলে তা পুরো খামারে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাই নতুন মুরগিকে কয়েকদিন আলাদা রেখে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। এই সময় তাদের
আচরণ, খাওয়া-দাওয়া, শারীরিক অবস্থা এবং কোন রোগের লক্ষণ আসে কিনা তা ভালোভাবে
নজরে রাখতে হয়। যদি কোন ধরনের অসুস্থতা এর মধ্যে ধরা পড়ে তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা
নেয়া উচিত।
এই আলাদা রাখার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আর এতে করে সুস্থ মুরগিগুলোকে নিরাপদে এবং
সংক্রমক রোগ সারানোর ঝুঁকি অনেকাংশ কমে যায় এবং পুরো খামারকে রোগমুক্ত রাখা
যায়।
টিকাদান নিশ্চিতকরণ:পোল্ট্রি মুরগির সুস্বাস্থ্যের জন্য অবশ্যই খামারি
ভাইদের টিকাদান নিশ্চিত করনের জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। নিচে তা বুঝানো
হলো-
১. রানীক্ষেত রোগ(NEW CASTLE DISEASE):, রানীক্ষেত রোগ পোল্ট্রি মুরগির
জন্য একটি অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ। এর কারণে তার দ্রুত এক মুরগি থেকে
অন্য মুরগিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগে আক্রান্ত খামারের সঠিক পোল্ট্রি ফার্ম
বায়োসিকিউরিটি না মানলে টিকা দান সঠিকভাবে না করলে দেখা দিয়ে থাকে। আসুন আমরা এ
রোগের লক্ষণ গুলো জানার চেষ্টা করি-
✹লক্ষণ-
* শ্বাসকষ্ট ও হাঁচির কাশি
* ঘাড় বেঁকে যাওয়া
* শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা
* খাবার ও পানিতে অনীহা তৈরি হওয়া
* সর্বোপরি ডিম উৎপাদন কমে যাওয়া।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা: রানীক্ষেত রোগের নির্দিষ্ট কোন সম্পূর্ণ চিকিৎসা
নেই, তবে সঠিক টিকা প্রদান করলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পোল্ট্রি মুরগির রোগ
প্রতিরোধ করার জন্য নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভ্যাকসিন দিতে হবে এবং আক্রান্ত
মুরগিকে দ্রুত আলাদা করে রাখতে হবে। পাশাপাশি খামারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বায়ো
সিকিউরিটির ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার করতে হবে।
২.গাম্বোরো রোগ(GUMBORO DISEASE): গাম্বোরো রোগ পোল্ট্রি মুরগি একটি
ভাইরাসজনিত সংক্রমক রোগ। যার ফলে সাধারণত ছোট বয়সেই এই ধরনের রোগ মুরগির মধ্যে
বেশি দেখা দেয়। তাই সতর্কতার সাথে পোল্ট্রি খামারের চিকিৎসা করা উচিত। খামারে এই
রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং খামারের উৎপাদনের ক্ষমতার ওপর মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর
প্রভাব বিস্তার করে। আসুন আমরা এ রোগের লক্ষণ জানার চেষ্টা করি-
✹লক্ষণ-
* পাতলা ডায়রিয়া পানির মত পায়খানা
* দুর্বল হয়ে যাওয়া
* শরীর নিস্তেজ হয়ে যাবে
* খাবার গ্রহণ করা ছেড়ে দেবে
* দ্রুত মুরগির ওজন কমে যাবে।
প্রতিকার ও প্রতিরোধ:গাম্বোরো রোগের জন্য নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী টিকা প্রদান
করা সব থেকে বেশি কার্যকরী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্তমানে ধরা
হয়।পাশাপাশি খামারের সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা রাখা এবং জীবণুনাশক
ব্যবহার করা দরকার। যদি খামারে কোন নতুন মুরগি এসে থাকে তাহলে নতুন মুরগিকে আলাদা
রেখে পর্যবেক্ষণ করলে সংক্রমণ কমানো সম্ভব হবে।
কক্সিডিওসিস রোগ(COCCIDIOSIS DISEASE): পোল্ট্রি মুরগির একটি সাধারন কিন্তু ক্ষতিকারক পরজীবী জনিত রোগ, যা মূলত নোংরা পরিবেশ ভেজা লিটার এবং জীবাণুর সংক্রমণের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে থাকে। এই রোগ হলে মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি কমে যায় খামারে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। তাই এর কিছু লক্ষণ জানা প্রয়োজন যা থেকে পূর্ব সর্তকতা সংকেত হতে পারে।
✹লক্ষণ-
* রক্ত যুক্ত পায়খানা করবে
* সহজে হাঁটা চলাফেরা করতে পারবেনা
* সুস্বাস্থ্য ব্যাহত হবে
* শরীর নিস্তেজ হবে।
* সহজে হাঁটা চলাফেরা করতে পারবেনা
* সুস্বাস্থ্য ব্যাহত হবে
* শরীর নিস্তেজ হবে।
পোল্ট্রি খামারে লাভের হিসাব: পোল্ট্রি মুরগির খামার বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের
অন্যতম লাভজনক এবং দ্রুত বর্ধনশীল কৃষি ভিত্তিক ব্যবসা গুলোর মধ্যে অন্যতম। সঠিক
সুপরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি অল্প সময়ে একটি স্থায়ী আয়ের
উৎসে পরিণত হতে পারে। তবে পরিকল্পনা ছাড়া শুরু করলে আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি
থাকে। তাই শুরু করার আগে খরচ এবং আয়ের সঠিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরী।
লাভের উপর পোল্ট্রি খামারের নির্ভরশীলতা: একটি পোল্ট্রি খামার মুনাফা নির্ভর করে
কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর-
* মুরগির সংখ্যা ও প্রজাতি
* খাদ্যের খরচ ও মান নির্ভরতা
* রোগ ব্যবস্থাপনা ও মৃত্যুহার
* বাজারের মূল্য ও বিক্রির সময়
* বায়ো সিকিউরিটি ব্যবস্থা
এই ব্যবস্থাগুলো সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই খামারের লাভ উল্লেখযোগ্যভাবে
বৃদ্ধি পাবে।
ব্রয়লার খামার লাভের হিসাব: ব্রয়লার খামার ৩০ থেকে ৪৭ দিনের মধ্যে
একটি ব্যাচ বিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এটা একটা আয়ের ব্যবস্থা। খরচের
মধ্যে সবথেকে বড় অংশ হলো খাদ্য যা মোট খরচের প্রায় ৬৭ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ
পর্যন্ত হতে পারে। তাই ফিড ব্যবস্থা ঠিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
✅ লাভ বাড়ানোর উপায়-
* মানসম্মত ফিড ব্যবহার করা
* সঠিক ওজন বজায় রাখা
* রোগ প্রতিরোধ নিশ্চিত করা।
দীর্ঘমেয়াদী আয় হিসেবে লেয়ার খামার: লেয়ার খামারে দীর্ঘমেয়াদী আয় হয়।
লেয়ার খামারের আয়ের ডিম উৎপাদনের মাধ্যমে। তবে সাধারণত ১৮ থেকে ২০ সপ্তাহ বয়স
হয়ে গেলে ডিম উৎপাদন শুরু হয় এবং ৭২ সপ্তাহ পর্যন্ত তা চলতে পারে। একটি
স্থিতিশীল আয়ের উৎস যেখানে সময়ের সাথে সাথে নিয়মিত ক্যাশ ইনকাম তৈরি হয় এর
মাধ্যমে।
একটি খামারের প্রধান খরচ গুলো হল-
* মুরগির বাচ্চা
* খাদ্য ব্যবস্থা
* ভ্যাকসিন ঔষধ
* শ্রম ও অন্যান্য খরচ।
লাভ বাড়ানোর কলাকৌশল: যেকোনো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তৈরি করা খামারের
ক্ষেত্রে সব থেকে বড় কৌশল হচ্ছে লাভ বাড়ানোর ব্যবস্থা করা আর
পোল্ট্রি মুরগি
চাষের মাধ্যমে এবং কিছু কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে লাভ বাড়ানো যায় তার নিম্নে
দেওয়া হল-
* উন্নত মানের খাবার ব্যবহার করা
* নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা
* সঠিক সময় বাজারজাত করা
* মৃত্যু হওয়ার কম রাখা
* বায়ো সিকিউরিটি ব্যবস্থাকে ঠিক রাখা
আসুন আমরা জেনে নেই কেন পোল্ট্রি খামার লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান
সময়ে-
* আয় শুরু হয়ে যায়
* বাজারে চাহিদা সব সময় থাকে
* মানুষের কাছে পোলট্রির মাংসের চাহিদা আছে
* ছোট জায়গায় শুরু করা সম্ভব হয়
* দ্রুত ঘুরে বেড়ানোর ক্ষমতা আছে।
নতুনদের জন্য পোল্ট্রি খামার পরামর্শ: নতুনদের জন্য একটি সম্ভাবনার ব্যবসা হিসেবে
সুযোগ হতে পারে। তবে সঠিক জ্ঞান এবং সুপরিকল্পনা ছাড়া শুরু করলে অনেক সময়
আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। তাই নতুন খামারীদের শুরু থেকে কিছু
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা প্রয়োজন।
যারা নতুন খামারি ভাই আছেন কিংবা যারা খামার শুরু করতে চাচ্ছেন তাদের অবগতির জন্য
বলে রাখা প্রয়োজন যে প্রথমত ছোট পরিসরে খামার শুরু করাটা সবথেকে বুদ্ধিমানের
কাজ। এতে করে ঝুঁকি কম থাকে এবং ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। শুরুতেই বড়
বিনিয়োগ না করে 100 থেকে 300 মুরগী দিয়ে শুরু করলে আপনার খামার ব্যবস্থাপনা বেশ
ভালো হবে।
দ্বিতীয়ত খামারের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পোল্ট্রি
খামারের জন্য ধরা হয়। খোলামেলা বাতাস চলাচল করতে পারে এমন জায়গায় বেছে নিতে
পারলে আরো ভালো। সহজে বর্ষাকালে পানি জমে না এমন উঁচু স্থান নির্বাচন করা উচিত
এবং খামার জন্য আবাসিক এলাকার খুব কাছাকাছি না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
পঞ্চমত যারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খামার ব্যবসা করে লাভবান হতে চান বিশেষ করে
পোল্ট্রি মুরগির ব্যবসা যারা করতে চান তাদের জন্য অবশ্যই একটা বিষয়ে মাথায়
রাখতে হবে নিয়মিত টিকাদান ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যাতে নিশ্চিত হয় সেদিকে
গুরুত্ব রাখতে হবে। আপনি প্রয়োজনে নিজে এক বেলা কম খান কিন্তু এদিক দিয়ে আপনাকে
অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। কারণ খামার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং বায়ো
সিকিউরিটির মেনে চললে রোগের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। তার সাথে উৎপাদন বাড়ে।
ষষ্ঠ তো প্রতিদিন মুরগির আচরণ পর্যবেক্ষণ করবেন। কোন মুরগি অসুস্থ মনে হলে দ্রুত
আলাদা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষ করে কোন নতুন মুরগি যখন খামারে আবির্ভাব ঘটান
তখন এ বিষয়টি বেশি করে নজরে রাখতে হয়।
সর্বশেষে একটি বিষয় আপনাদেরকে বলতে চাই যে বাজার সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি কারণ
বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে তা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
উপসংহার: নতুনদের জন্য পোল্ট্রি খামার শুরু করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং মনে হলেও সঠিক
পরিকল্পনা, মানসম্মত বাচ্চা নির্বাচন, সুষম খাদ্য নিয়মিত টিকাদান এবং বায়ো
সিকিউরিটি মেনে চললে এটি একটি লাভজনক এবং টেকসই বাণিজ্যিক খামারে পরিণত হতে পারে।
প্রতিদিনের পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে যেমন রোগের
ঝুঁকি কমানো যায়। পাশাপাশি বাজারের পরিস্থিতি বুঝে সঠিক সময় বিক্রি করতে পারলে।
শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়েছে। খামার পরিচালনার সময় স্থান ভেবে,
আবহাওয়া, জাত খাদ্য রোগের পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে তাই কোন গুরুতর রোগ এবং
অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে অবশ্যই নিকটস্থ প্রাণিসম্পদ অফিস এবং অভিজ্ঞ
ভেটেনারি ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url